গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে সীমাবদ্ধ তারুণ্যের শক্তি
বাংলাদেশে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের ফল হিসেবে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণদের পরিচালিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। রাজপথের আন্দোলনের জোয়ারকে কাজে লাগিয়ে ব্যালট বাক্সের ভোটে রূপান্তর করা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, এই ফলাফল তারই প্রমাণ।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায়, ভোটাররা ব্যাপকভাবে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে বেছে নিয়েছে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে। দলটি এর আগে তিনবার দেশ শাসন করেছে এবং সর্বশেষ ২০০১-২০০৬ মেয়াদে দেশের ক্ষমতায় ছিল। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এনসিপি। তবে এই নির্বাচনে তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের অংশ হিসেবে লড়াই করে আশানুরূপ ফল পায়নি।
জোটের কারণে সমর্থকদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতার অনুভূতি
এনসিপির অনেক সমর্থক মনে করেন, গত ডিসেম্বরে আরেকটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি ইসলামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কারণেই এনসিপি কার্যত লড়াই থেকে ছিটকে পড়ে।
দল গঠনের শুরুর দিকে এনসিপি প্রায় সব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোটের অংশ হিসেবে মাত্র ৩০টি আসনে লড়াই করে তারা। এনসিপি দাবি করেছিল, ঢাকায় অভ্যুত্থানের এক অগ্রসৈনিক নিহত হওয়ার পর তারা একটি বড় শক্তির সমর্থন প্রয়োজন মনে করায় এই জোটে যোগ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত জনসমর্থন তৈরি করতেও ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি।
২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা তারা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট আমাদের মতো অনেক তরুণ ভোটারের কাছে একটি বড় বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হয়েছে, তাই আমরা তাদের সমর্থন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এনসিপি থেকে বিজয়ী ছয়জনের মধ্যে একজন হলেন ৩২ বছর বয়সী আইনজীবী ও দলের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, দল আরও বেশি আসনে জয়ের আশা করেছিল এবং অনেক আসনেই তারা খুব সামান্য ব্যবধানে হেরেছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা কেবল আমাদের যাত্রা শুরু করেছি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে নামার সময় আমরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাই।’
আগামী বছরের স্থানীয় নির্বাচনে দলের লক্ষ্য
আবদুল্লাহ আল আমিন মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় এনসিপি এই আসনগুলো জিততে পেরেছে। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, এই জোট সেই তরুণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে যারা শেখ হাসিনার পতনের পর একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক শ্রেণি আবির্ভূত হোক তা দেখতে চেয়েছিল।
অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, অনেকে একে নতুন ধারার বদলে পুরনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন। এই সিদ্ধান্ত তরুণদের ভোটকে বিভক্ত করেছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সমর্থন আরও শক্তিশালী করেছে, যাদের অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং দেশ পরিচালনায় সক্ষম মনে হয়েছে।
এনসিপি-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, দলটি বিরোধী শিবিরে থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে নজর দেবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম গত ডিসেম্বরে জানিয়েছিলেন, নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তারা পর্যাপ্ত সময় পাননি। এছাড়া তহবিলের অভাব এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে অস্পষ্ট অবস্থানের কারণেও দলটি পিছিয়ে পড়েছে।
শাকিল আহমেদ বলেন, এনসিপি যদি নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করতে না পারে এবং অস্পষ্ট বার্তা দেয় এমন জোট থেকে দূরে না থাকে, তবে তারা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হওয়ার বদলে কেবল একটি প্রতীকী আন্দোলনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
তরুণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরাজিত প্রার্থী হলেন ৩১ বছর বয়সী চিকিৎসক তাসনিম জারা। তিনি ডিসেম্বরে জোট গঠনের প্রতিবাদে এনসিপি ছেড়ে ঢাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেছিলেন। তিনি ৪৪ হাজারের বেশি ভোট পেলেও বিএনপি প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান।
তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি যে একটি পরিচ্ছন্ন ও সৎ প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট হয়েছে। স্বচ্ছ রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে একে শক্তিশালী হতে হবে।’ তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা তাকে আশাবাদী করেছে এবং তিনি ব্রিটেনে তার চিকিৎসা পেশায় ফিরে যাবেন না। তাসনিম জারা বলেন, ‘আমাদের সেরা দিনগুলো এখনো সামনে পড়ে আছে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক