ঢাকা-২০ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুই কোটিপতি প্রার্থী
ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুই কোটিপতি প্রার্থী। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরেফিরে তারাই। তা সত্ত্বেও নেই তেমন কোন আমেজ, এলাকা ঘুরেও চোখে পড়েনি ভোটের উন্মাদনা। সব মিলিয়ে নিরুত্তাপ ভোটের পরিবেশ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বয়স, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা আর জনপ্রিয়তা বিবেচনায় অসম প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হয়েছে বিএনপির প্রার্থী তিনবারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিনকে। যদিও বিগত চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায় ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির দুর্গখ্যাত ঢাকার শেষ এই আসনটি।
এবার জামায়াত ইসলামীর পিঠে সওয়ার হয়ে সেই দুর্গ দখলে নিতে চায় গণঅভ্যুত্থানে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। তাদের মনোনীত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ শাপলা কলি নিয়ে লড়ছেন বিএনপির ধানের শীষের বিরুদ্ধে। তফসিল ঘোষণার আগে এনসিপির প্রার্থীকে সেভাবে কেউ না চিনলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহরতলীর বাসিন্দাদের অনেকের কাছেই এখন তিনি কিছুটা পরিচিত।
৭১ বছর বয়সী তমিজ উদ্দিনকে তাই বেশ হিসেবে নিকেশ করেই আটঘাট বেঁধে নামতে হয়েছে তার অর্ধেকও কম বয়সের এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ধামরাইয়ের স্থায়ী বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন পেশায় ব্যবসায়ী। একবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও তিনবারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে ভোটের ময়দান তার কাছে মুখস্ত। আওয়ামী লীগের আমলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে আস্থা কুড়িয়েছেন দলের হাইকমান্ডের। নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে একেবারেই শেষ ধাপে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন তিনি। উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিন বরাবরই জননন্দিত। সততা, সাহস, ধৈর্য ও ব্যবহারেও অতিক্রম করেছেন তাঁর সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের।
নির্বাচনে পরাজিত হবার রেকর্ড নেই বরং আওয়ামী লীগের আমলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরপর দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন চেয়ারম্যান হিসেবে। তৃণমূলের পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করলেও এবারই প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সংসদ নির্বাচনে।
নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তমিজ উদ্দিনের সম্পদের পরিমাণ ৯১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং স্থাবর সম্পদের মূল্য ৫ কোটি ৬০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি। ঢাকার গ্রীন রোড ও ধামরাইয়ে একাধিক বহুতল ভবন ও জমি রয়েছে। ব্যবসা ও ভাড়া থেকে তার বার্ষিক আয় প্রায় ৫২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়াও ইসলামী ব্যাংকে তার নামে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।
অন্যদিকে হলফনামা অনুযায়ী পেশায় ব্যবসায়ী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ স্বামী ইমদাদুল হকের চাইতেও দ্বিগুণ সম্পদের মালিক।
সর্বশেষ আয়কর রিটার্নে ১ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার ৬৪ টাকার অর্থ সম্পদের মালিক হলেও নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে তহবিল সংগ্রহ করছেন হাত পেতে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের বিকাশ, নগদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে অর্থ সাহায্য চাইছেন তিনি।
আর এখানেই ভোটারদের অনেকের কাছে নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এতে নিজ দল ছাড়াও জোটের কর্মী সমর্থকরাও বিব্রত। অনেকেই স্মরণ করছেন পেশায় বাবুর্চি থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানো সিলেটের ‘ছক্কা ছয়ফুর’কে।
তার বক্তৃতা শুনতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ভিড় হতো। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরেই তিনি এক টুকরো কাপড় বের করে সামনে রাখতেন, তারপর সবাইকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলতেন, ‘আমি এই যে আপনাদের জন্য আন্দোলন করতেছি, আমার মাইকের খরচ দিবে কে? মাইকের খরচ দেন।’
আশির দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
ধামরাইয়ের ভোটাররা বলছেন, কোটিপতি ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন এই প্রার্থী। হাত পেতে চাইছেন আর্থিক সহযোগিতা।
কেন? নির্বাচন পরিচালনায় নিজের অর্থ খরচ করতে তার দ্বিধা কোথায়? তিনি কি কইয়ের তেলে কই ভাজতে চান- খবর শুনে এমনটি বলছিলেন ধামরাই সদরের বাসিন্দা মোকাররম হোসেন।
“এবার আমরা ভিন্ন কিছু চেয়েছিলাম। রাজনীতি কেউ যাতে ব্যবসার হাতিয়ার না করে সেটাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। অথচ দেখুন কোটিপতি প্রার্থী হয়েও মানুষের কাছে হাত পাচ্ছেন তিনি। সত্যিই ভোটার হিসাবে আমি ব্যথিত’ যোগ করেন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মোকাররম হোসেন।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী অপর চার প্রার্থী হলেন, ঢাকা জেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি মুফতি আশরাফ আলী, জাতীয় পার্টির আহছান খান, এবি পার্টির (অব.) কর্নেল হেলাল উদ্দিন এবং বাংলাদেশ জাসদের আরজু মিয়া।
প্রতিদ্বন্দ্বী এসব প্রার্থীদের বেশিরভাগ নিষ্ক্রিয় থাকায় তাদের কেউ দাঁড়িয়েছেন নিজের পরিচিতি বাড়াতে কেউবা জয়-পরাজয় নয়- কেবলমাত্র নিয়মরক্ষার প্রার্থী হতেই- এমনটি বলছেন ভোটাররা।
তমিজ উদ্দিন জানান, ধামরাইয়ের মানুষ আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনে, জানে। আমি তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলাম। দলীয় সংকীর্ণতা ভুলে বিপরীত রাজনৈতিক দলের অনেকেই ধানের শীষে ভোট দেবে। নির্বাচিত হলে আমার প্রথম পদক্ষেপ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত ধামরাই গড়া।
দীর্ঘদিন এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ভোট চেয়ে বেড়ানো প্রার্থী আবদুর রউফ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে গত ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে এনসিপির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদকে সমর্থন দিলে হতাশায় ভেঙে পড়ে দলটির নেতা-কর্মীরা। তবে হাইকমান্ডের নির্দেশে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নারী প্রার্থীর পক্ষেই চালাচ্ছেন প্রচার-প্রচারণা।
এর বাইরে নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়েও চ্যালেঞ্জে রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ। প্রচার যুদ্ধে নেওয়ার আগেই তাকে দলের নেতা-কর্মীরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলনে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাবিলাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় দলের নেতা-কর্মীরা। যদিও পড়ে তা মীমাংসা করা হয় ঘরোয়া পরিবেশে।
সব মিলিয়ে সাধারণ ভোটারদের রায় কতটা পক্ষে আসবে তা নিয়েই খোদ নিজ দলেই রয়েছে সংশয়, সন্দেহ। জাতীয় নাগরিক পার্টির ধামরাই উপজেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ইসরাফিল হোসেন খোকন বললেন, কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের সঙ্গে বৈঠক করে মিলমিশ করিয়ে দিয়েছেন। আমরা শাপলা কলির পক্ষে একতাবদ্ধ।
কথা হয় চৌহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল গফুর ও মোশারফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, নাবিলা তাসনিদ যে আমাদের এলাকার মেয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আমাদের কেউ এটা জানতো না। গুলশানের বাসিন্দা এই নারী ধামরাইবাসীর হৃদয় কতটা জয় করবে তা দিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে একটা বিষয় আমাদের বুঝে আসেনা, এটা তো অর্থ সম্পদের মালিক হয়েও তিনি কেন নির্বাচনে তহবিলের জন্য হাত পাতছেন। এলাকার বাসিন্দা হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার।
সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ বলেছেন, “শাপলা কলির পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। ইনশাল্লাহ ১২ তারিখে নতুন ইতিহাস রচনা করবে ধামরাইবাসী।”
১৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা নিয়ে গঠিত ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৯ জন। এর মধ্যে নারী ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮০২ জন ও পুরুষ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৩৫ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন। উপজেলার ১৪৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ।
ধামরাই থেকে ফেরার পথে ইসলামপুরে কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শরীয়তুল্লাহর সঙ্গে। জানান, ঐতিহাসিকভাবেই এই আসনটি বিএনপির দুর্গ। এখানে সব সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গেই নির্বাচনের খেলা জমেছে বিএনপির। এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটির শীর্ষ নেতারা পলাতক আর কর্মী সমর্থকরা রয়েছেন গা ঢাকা দিয়ে। তাই এ নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের কাছে কোন বাড়তি আগ্রহ কিংবা উন্মাদনা নেই। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী বিএনপি এবারের মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর খরায় পড়েনি কখনো। এমন পরিস্থিতিতে ফলাফল কী হবে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। তারপরেও কথা থাকে। বিএনপি এক্ষেত্রে নির্ভার হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন ভোটারদের মনোভাব ফলাফল কে কতটা প্রভাবিত করে সেটাই দেখার অপেক্ষায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন।

জাহিদুর রহমান