জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে : টাইমকে তারেক রহমান
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মানুষ যাতে রাস্তায় নিরাপদ থাকে এবং নিরাপদে ব্যবসা করতে পারেন তা নিশ্চিত করা। জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত দৃঢ় দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পায়। আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে।
১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সাময়িকীটির ওয়েবসাইটে ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়।
দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণের ঘটনা প্রসঙ্গে ভেজা চোখে তারেক রহমান বলেন, আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। কিন্তু আমি তার কাছে যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো—যখন আপনার কোনো দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে তা পালন করতে হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হয়েছেন। ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটি আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।
তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, ক্ষত-বিক্ষত এ জাতিকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে তিনিই যথোপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি বলেন, এটা এই কারণে নয় যে আমি আমার বাবা-মায়ের (সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া) সন্তান। আমার দলের সমর্থকদের কারণেই আজ আমি এখানে।
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশিরা তারেক রহমানের ওপর আস্থা রাখতে চান বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকের জনমত জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন রয়েছে। যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন রয়েছে ১৯ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার রায় বাতিল করেছে। তিনি বলেন, অভিযোগকারীরা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।
এটা অবশ্য সত্য, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারকে অনুগত সংবাদমাধ্যম সাহায্য করছিল, যারা অন্ধভাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এতে এক হাজার ৪০০ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হন বহু মানুষ।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের একটি অত্যন্ত দৃঢ় দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পায়।
তারেক রহমানকে মৃদুভাষী। তিনি শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় বিনোদন ছিল রিচমন্ড পার্কে ঘুরে বেড়ানো, চিন্তায় ডুবে থাকা অথবা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় সিনেমা হলো এয়ার ফোর্স ওয়ান। তিনি বলেন, আমি সম্ভবত আটবার দেখেছি!
তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—পানির স্তর নেমে যাওয়া ঠেকাতে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, ভূমি অবক্ষয় রোধে বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো এবং রাজধানীর বায়ুদূষণ হ্রাসে ৫০টি নতুন ‘সবুজ জায়গা’ তৈরি করা। তার পরিকল্পনা আছে আবর্জনা পোড়ানোর জন্য বৈদ্যুতিক জেনারেটর স্থাপন, অভিবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি কলেজ নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দুর্ভোগ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব করা।
তারেক রহমান বলেন, যা পরিকল্পনা করেছি তার মাত্র ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন দেবে।
২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমানকে ৮৪টি অভিযোগে ১৮ মাস কারাবন্দি রাখা হয়েছিল। কারাগারে তিনি নির্যাতন সহ্য করেছিলেন। এর ফলে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে কষ্ট দেয়। মূলত চিকিৎসার জন্যই তিনি যুক্তরাজ্যে চলে গিয়েছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, যদি শীত খুব তীব্র হয়, তাহলে আমার পিঠে ব্যথা হয়। কিন্তু এটি আমাকে মানুষের প্রতি দায়িত্বের বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে অন্যরা যাতে এই ধরনের কষ্ট না পায়, সেজন্য আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, তিনি উভয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন।
তারেক রহমান বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন। আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। কিন্তু আমরা একে অপরকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত ট্রাম্প খুবই ন্যায়সঙ্গত মানুষ।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মানুষ যাতে রাস্তায় নিরাপদ থাকে এবং নিরাপদে ব্যবসা করতে পারেন তা নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিষয়ে তারেক রহমান নীতিগতভাবে তার অবস্থান তুলে ধরেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা তিনি পছন্দ করেন না।
তারেক রহমান বলেন, আজ যদি আপনি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন, তাহলে আগামীকাল আপনি আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এই নিশ্চয়তা কি আছে?
তারেক রহমান আরও বলেন, অবশ্যই, যদি কেউ কোনো ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই পরিণতি ভোগ করতে হবে।
সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, মানুষ কেবল এমন একটি গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায়—যেখানে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, যেখানে তারা নিজেদের প্রকাশ করতে পারবে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে, তবে এরপর আমরা (ভারতের সঙ্গে) সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।
লন্ডনে কাটানো জীবনের কোন জিনিসগুলো মিস করছেন জানতে চাইলে, তারেক রহমান বলেন, ‘আমার স্বাধীনতা।’ বাসভবনের চারপাশে থাকা ১০ ফুট কাঁটাতারের বেড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, যখন আমি এই বাড়িতে এসে এই সমস্ত নিরাপত্তা দেখেছি, তখন আমার মনে আঁতকে ওঠার মতো ভয় কাজ করছিল। তবে এ নিয়ে অভিযোগ নেই।
তারেক রহমানের বলেন, জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তিনি মূল বিষয়টি স্পষ্ট করতে একটি প্রিয় সিনেমার উক্তি ব্যবহার করেন। সেটি হলো স্পাইডার-ম্যান থেকে—‘মহান ক্ষমতার সঙ্গেই আসে মহান দায়িত্ব। আমি এটা খুব বিশ্বাস করি।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক