সরকার গঠন করতে পারলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব : জামায়াত আমির
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে ১০ দলীয় ঐক্য জোট আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমির বলেন, নদী জীবন ফিরে পেলে উত্তরবঙ্গ জীবন ফিরে পাবে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে কারো ভালো লাগে এবং কারো লাগবে না, এতে আমাদের কিছু যায় আসে না। আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিলে, উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তাতেই কোদাল বসাব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো একক দলের শাসন আমরা চাই না, আমরা চাই জনগণের শাসন। যেখানে আলেম-ওলামা থাকবেন, দেশপ্রেমিক মানুষ থাকবেন-যারা দেশকে ভালোবাসেন, কিন্তু আধিপত্যবাদ মেনে নেবেন না। সবাইকে নিয়েই আগামীর বাংলাদেশ গড়ব, ইনশাল্লাহ।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে কাজ করার জন্য তিনটি শর্ত মানতে হবে—নিজে দুর্নীতি করবেন না, কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেবেন না এবং গরিব-ধনী, নারী-পুরুষ, সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন; সেখানে কোনো রাজনীতিবিদের হস্তক্ষেপ থাকবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে নিষ্পেষিত ছিল। মানবিক যে অধিকার পাওয়ার কথা ছিল, তা পাওয়া হয়নি। কানাডার বিশাল একটি জায়গায় শুধু পালিয়ে যাওয়া লোকেদের পরিবার থাকে। যেহেতু ওই সমস্ত জায়গায় তাদের বেগমরা থাকে, তাই নাম দিয়েছে বেগমপাড়া। এত লুটপাট করে কী লাভ হলো? শান্তি তো পেলেন না। আপনারা আলেম-ওলামাদের খুন করেছেন। একটা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য একটা নারীকে ছিন্নভিন্ন করেছিলেন। আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত আব্রু নিয়ে নোংরামি করার চেষ্টা করেছেন। ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে চব্বিশের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে হত্যা, আহত, গুম করা হয়েছে। জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জামায়াতের ১১ জন সিনিয়র নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের এক হাজারের ওপরে নেতা-কর্মীকে খুন করা হয়েছে। শত শত মানুষকে গুম করে আয়নাঘরে নিয়েছিল। ৫ তারিখের পর আমাদের আশা ছিল শান্তিতে বসবাস করব। কিন্তু আমাদের আশায় গুড়ে বালি। রংপুরের মানুষ শান্তশিষ্ট। তারা অল্পে তুষ্ট।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা নিরীহ কোনো মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করি নাই। নিরপরাধ কারো নাম ঢুকে গেলে আমরা তাদের মুক্ত করে দিয়েছি। কাউকে ছাড়ানোর জন্য খাজনা চাই নাই। আমরা চাই চাঁদাবাজ, দুর্নীতিমুক্ত, অসৎ ও প্রতারকমুক্ত বাংলাদেশ। কোনো অসৎ, মজার মজার মিথ্যা ওয়াদা দিলে তাদের লাল কার্ড দেখাবেন। এই দেশে আমরা চারটি ধর্মের মানুষ বসবাস করি। আল্লাহ আমাদের নিজ ইচ্ছায় এই দেশে পাঠিয়েছে। আল্লাহ সব ধর্মের মানুষের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন। কোনো মুসলমান অন্য কোনো ধর্মের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আমরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইরান বানাতে চাই না। আমরা বাংলাদেশকে প্রিয় গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে তৈরি করতে চাই।
কোনো বেকার ভাতা দিতে চান না—উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, বেকারভাতা বেকারের কারখানা তৈরি করে। আমরা নারী-পুরুষকে কাজ দিতে চাই। আমরা দেশের নারী-পুরুষকে সম্পদে পরিণত করতে চাই। আমাদের সবার ঘরে মা-বোন আছে। সুতরাং নারীরা ঘরের পাশাপাশি বাইরেও সম্মানের সাথে কাজ করতে পারবে। রাসূল (সা.) এর সময় নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। নারী কোন ধর্মের, আমরা তা দেখব না। আমরা দেখব কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন। যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের মা-বোনদের সম্মানজনক কাজ দেওয়া হবে।
জামায়াত আমির আরও বলেন, আমাদের সঙ্গে সবাই আসতে পারবেন। তবে আসতে হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে। প্রথমত, দুর্নীতি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ইচ্ছা থাকতে হবে; বিচার ব্যবস্থায় কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না। তৃতীয়ত, গত ৫৪ বছরের বস্তাপচা রাজনীতি বাদ দিয়ে আসতে হবে। গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেশকে শুধু পেছনের দিকে নিয়ে গিয়েছে। আমরা উত্তরবঙ্গকে কৃষিশিল্পের রাজধানীতে পরিণত করব ইনশাআল্লাহ। উত্তরবঙ্গে প্রয়োজনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করব। আমরা বলেছিলাম, কারো কোনো ক্ষতি করব না, আমরা করিনি।
উত্তরবঙ্গ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গ গরিব ছিল না; ইচ্ছাকৃতভাবেই এই অঞ্চলকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে, অথচ এই উত্তরবঙ্গই দেশকে খাদ্য ও পুষ্টি জোগান দেয়। আগামী দিনে উত্তরবঙ্গ থেকে আর কোনো বেকারের মুখ দেখতে চাই না। প্রত্যেক যুবক-যুবতীকে মর্যাদার কাজের মাধ্যমে দেশ গড়ার কারিগর বানানো হবে। বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো চালু করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
জামায়াত আমির বলেন, আমাদের কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের কার্ড। আপনাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়ায় দয়ার পাত্রমুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই। তিনি দাবি করেন, বিপদের সময় দেশবাসীকে ফেলে আমরা কোথাও যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের মানুষকে ঢাকামুখী হতে হয়, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের কোনো জেলাই মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না। ঠাকুরগাঁওয়েও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমরা একা বাংলাদেশ গড়তে পারব না। তাই এবার শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, বাংলাদেশের মুক্তিকামী ১০ দলের জোটকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে।
বেকার ভাতা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, অনেকে ক্ষমতায় গেলে বেকার ভাতা দেওয়ার কথা বলছেন। আমরা কারও হাতে অসম্মানের চাবি তুলে দিতে চাই না; আমরা সম্মানের কাজ তুলে দিতে চাই।
৫৪ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে জামায়াত আমির আরও বলেন, বস্তাপচা রাজনীতি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনে দেশকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে, বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। অর্থনৈতিক দুর্নীতির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে চুরি করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করা হবে এবং ভবিষ্যতে কাউকে আর লুটপাট করতে দেওয়া হবে না।
ভোটাধিকার নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারা মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
জামায়াত নেতা এ টি এম আজহার, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ছয়টি সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী এবং ১০ দলীয় জোটের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)