কেরানীগঞ্জে মা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪
ঢাকার কেরানীগঞ্জে এনজিও ঋণের জামিনদার হওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে লুকিয়ে রাখার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। নিখোঁজের ২১ দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের মুসলিমবাগ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত গৃহশিক্ষিকা মিম আক্তার, তার স্বামী হুমায়ুন, বোন নূরজাহান বেগম ওরফে নুসরাতসহ পরিবারের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নিহতরা হলেন—আইনজীবীর সহকারী মো. শাহীন মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া রহমান (৩২) ও তার মেয়ে জুবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪)। গত ২৫ ডিসেম্বর তারা নিখোঁজ হয়েছিলেন। গ্রেপ্তাররা হলেন—শিক্ষিকা মিম আক্তার, তার স্বামী হুমায়ুন ও বোন নুরজাহান বেগম ওরফে নুসরাতসহ পরিবারের আরও একজন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (এসআই) রনি চৌধুরী জানান, একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন গৃহশিক্ষিকা মিম আক্তার। নিহত রোকেয়া রহমান ছিলেন এই ঋণের জামিনদার (গ্যারান্টার)। মিম নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় এনজিও কর্তৃপক্ষ জামিনদার রোকেয়া রহমানকে চাপ সৃষ্টি করত। এ নিয়ে রোকেয়া ও মিমের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা ও গালিগালাজের ঘটনা ঘটে। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই মা-মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
এসআই রনি চৌধুরী আরও জানান, এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা তার গৃহশিক্ষিকা মিমের কাছে পড়তে গেলে নুসরাত তাকে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। সিসিটিভি ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে নুসরাত মৃত ফাতেমার পোশাক পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, যাতে মনে হয় ফাতেমা পড়া শেষে চলে গেছে। এর দুই ঘণ্টা পর ফাতেমা অসুস্থ বলে তার মা রোকেয়াকে ফোনে ডেকে আনা হয়। রোকেয়া ঘরে ঢুকলে দুই বোন মিলে তাকেও ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পর ফাতেমার মরদেহ বাথরুমের ফলস ছাদে এবং রোকেয়ার মরদেহ বক্স খাটের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, ঘরে দুটি মরদেহ রেখেই পরিবারটি সেখানে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছিল। এমনকি গত ৬ জানুয়ারি মিমের ছেলের জন্মদিন পালন করতে তারা সবাই মিলে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নানার বাড়ি ঘুরে আসে। বৃহস্পতিবার ঘর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে বাড়ির মালিক পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে খাটের নিচ ও বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষিকা মিম আক্তারসহ পরিবারের চারজন গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ভবনটির নিচতলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন কবিতা ও অসীম দম্পতি। তারা জানান, প্রায় দুই মাস আগে মিম আক্তার তাদের ওপরের দ্বিতীয় তলায় ভাড়া নেন। ওই ফ্ল্যাটে মোট তিনটি কক্ষ রয়েছে। মিম আক্তার কোনো চাকরিতে যুক্ত ছিলেন না, তিনি বাসায় টিউশনি করতেন। তার স্বামী হুমায়ুন রংয়ের ডিলারের ব্যবসা করেন।
এসআই রনি চৌধুরী আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গৃহশিক্ষিকা মিম আক্তার, তার স্বামী হুমায়ূন ও তার বোনসহ চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। পরে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রাথমিক স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মিম আক্তার ও তার বোনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেন, পূর্ব শত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

দেলোয়ার হোসেন, কেরানীগঞ্জ