বিএনপি-জামায়াতের জনসমর্থনের ব্যবধান ১.১ শতাংশ : জরিপ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস মিলেছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) আয়োজিত প্রাক-নির্বাচনি জনমত জরিপে।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রকাশিত এ জনমত জরিপে দেখা গেছে, বিএনপিকে ভোট দিতে চান ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার এবং জামায়াতে ইসলামিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের বৃহৎ দল দুটির মধ্যে জনসমর্থনের ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী এখনো সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন ১৭ শতাংশ ভোটার। এ ছাড়া ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৭ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশকে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য দলকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে প্রাক-নির্বাচনি জনমত জরিপ ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারেটিভের যৌথ উদ্যোগে এ জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকাশিত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে মধ্যে ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ভোট দেবেন। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের বিবেচনায় নিলে বিএনপির সমর্থন ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই জরিপটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত মোট ২২,১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন। ভৌগোলিক, শহর-গ্রাম ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সার্টিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন অনুসরণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-স্ট্রাটিফিকেশন ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে।
জরিপে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ও দলের সমর্থনের ভিত্তি:
বিএনপি: অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা-
বিএনপির ৭২.১ শতাংশ সমর্থক দলটির অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকে সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে: ৩০-৪৪ বছর (৩৮.৪%) এবং ৪৫-৫৯ বছর (৩৭.৪%) বয়সী কর্মক্ষম ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি। পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষক (৪২.৬৭%) ও শ্রমিকদের (৪০.৬%) মধ্যে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী: সততা ও পরিবর্তনের রাজনীতি-
জামায়াতে ইসলামির সমর্থকরা দলটিকে মূলত ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ (৪৪.৮%) এবং ‘সততার ভাবমূর্তি’ (৪০.৭%)-এর কারণে সমর্থন করছেন।
তাদের সমর্থনের ভিত্তি হলো
তরুণ প্রজন্ম : ১৮-২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সর্বোচ্চ (৩৩.৬%)।
উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী: স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দলটির সমর্থন ৩৭.৪%, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। ডিজিটাল মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দলটি এগিয়ে আছে।
এনসিপি ও জুলাই বিপ্লবের প্রভাব
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি)-কে সমর্থন করার পেছনে ৩৬.৭% মানুষ ‘জুলাই বিপ্লবে ভূমিকা’-কে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।
জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। তাদের মধ্যে ৩০.১% ভোটার জানিয়েছেন তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না এবং ৩৮.৬% ভোটার কোনো মতামত দেননি। এই ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি হবে ‘প্রয়োজনের শ্রেণিবিন্যাস’ (বিএনপির অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা) এবং ‘মূল্যবোধের শ্রেণিবিন্যাস’ (জামায়াতের সততা ও ন্যায়বিচার)-এর মধ্যে এক দার্শনিক ও রাজনৈতিক লড়াই। ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুশতাক খান ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুর প্রমুখ।

নিজস্ব প্রতিবেদক