সরকারি পুকুর ভরাট, অভিযোগ যুবলীগ-ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে
মাদারীপুর শহরের লঞ্চঘাট এলাকার পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো একটি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা অবৈধভাবে এটি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পৌরসভা থেকে পুকুরটি ভরাট বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পুকুরটির ভরাট বন্ধে নৌমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মাদারীপুর পৌরসভা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহরের পুরোনো বাজারের লঞ্চঘাট এলাকায় পুকুরটির অবস্থান। এটি প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো। দুই একর তিন শতাংশের এই পুকুরের মালিক জেলা প্রশাসন। পুকুরটি ভরাটের চেষ্টার বিষয়টি টের পেয়ে এটি রক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ গত এক বছরে জেলা প্রশাসককে তিন দফা চিঠি দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে পুকুরটিতে বালু ফেলা হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুকরে বালু ভরাট বন্ধের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পুকুরটির ভরাট বন্ধের দাবি জানিয়ে স্থানীয় অনেকে ও ফ্রেন্ডস অব নেচার নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন মঙ্গলবার শহরে মানববন্ধন করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদুল ইসলাম, ভাস্কর, খোকসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, পুকুরটিতে তাঁরা নিয়মিত গোসল করেন। এলাকাবাসীর দৈনন্দিন কাজে পুকুরটি ব্যবহার করা হয়।
মাদারীপুর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিলন ভুইয়া বলেন, ‘পুকুরটি ভরাট হয়ে গেলে পরিবেশে বিপর্যয় নামবে। আর ভবিষ্যতে ওই এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড হলে পানি সংকটে পড়তে হবে। গত কয়েক বছরে শহরের অধিকাংশ পুকুরই ভরাট করে ফেলা হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুকুরটি ভরাট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে ও মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের সাবেক জিএস ও জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রুবেল খান। এ ছাড়া জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর মাহমুদও এর সঙ্গে যুক্তে বলে জানা গেছে।
গতকাল বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২০ থেকে ২৫ নেতা সেখানে অবস্থান করছেন। পুকুরে একটি পাইপ দিয়ে বালু ফেলা হচ্ছে।
জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মাদারীপুর শহর রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি যত পুকুর আছে, সব ভরাট করার নির্দেশ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক অবহিত আছেন। তাঁদের অনুমতি নিয়েই আমরা ভরাট কাজ শুরু করেছি।’
সাইফুর রহমান রুবেল খান বলেন, ‘পুকুরটি ভরাট করে সরকার উন্নয়নকাজ করবে। নৌপরিবহনমন্ত্রী মাদারীপুরের উন্নয়ন করার জন্য পুকুর ভরাটের নির্দেশ দিয়েছেন।’
পৌর মেয়র মো. খালিদ হোসেন ইয়াদ এরই মধ্যে ড্রেজার মালিক শাহীন মুন্সি ও সৈয়দ রাজীবকে চিঠি দিয়ে পুকুর ভরাট বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র বলেন, শহরে পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুরটি বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ ছাড়া জলাধার ও পরিবেশ আইনে পুকুর ভরাট করা নিষেধ। দুঃখের বিষয়, জেলা প্রশাসন পুকুরটি রক্ষায় এগিয়ে আসছে না।
মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে পুকুরটি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক কামাল উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘পুকুরটির মালিক জেলা প্রশাসন। সেটি ভরাট করার অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। সেখানে কোনো উন্নয়নকাজ করারও কোনো নির্দেশনা নেই। পুকুর ভরাটের অভিযোগ পেয়েছি। এ ব্যাপারে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রদত্ত ৩১টি নির্দেশনার মধ্যে ৫ নম্বর নির্দেশনায় শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাশয় রক্ষার নির্দেশ দেন। আর জনস্বার্থে ও পরিবেশ বিপর্যয় রক্ষায় পুকুরটি ভরাট বন্ধের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

এম. আর. মুর্তজা, মাদারীপুর