সাতক্ষীরার জোড়া খুনে আরেকটি মামলা
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার চিংড়িখালী ভূমিহীন জনপদে জোড়া খুন ঘটনায় আরো একটি মামলা করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন খাসজমি দখলের সময় সংঘর্ষে নিহত ইসহাক গাজীর ছেলে ইসমাইল গাজী। এ নিয়ে এ ঘটনায় চারটি মামলা হলো।
গতকাল মঙ্গলবার ইসমাইল গাজী মামলাটি সাতক্ষীরার বিচারিক আদালত নম্বর-১-এ জমা দিয়েছেন। এ মামলাও আগের তিনটি মামলার সঙ্গে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গত ২৪ আগস্ট ভোরে খাসজমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে গণপিটুনির শিকার হন আশরাফ মীর ও তাঁর শ্যালক ইসহাক গাজী। পরে পুলিশ তাঁদের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে আশরাফ ও ইসহাক মারা যান।
ঘটনার পরই দুটি মামলা করে পুলিশ। তৃতীয় মামলার বাদী নিহত আশরাফ মীরের স্ত্রী ফজিলা খাতুন। এ মামলাটি আদালতে দাখিল করা হয়। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইসমাইল গাজী মামলায় উল্লেখ করেন, গত ২৪ আগস্ট তাঁর বাবা ইসহাক গাজী ও ফুফা আশরাফ মীর চিংড়িখালী বৈরাগীরচকে যাচ্ছিলেন। ওই এলাকায় তাঁরা ১২ বছর আগে থেকেই বসবাস করছেন। এ সময় লতাবাড়ী সাঁকো ও সুন্দরখালী এলাকা থেকে তাঁদের ওপর বোমা নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করতে থাকে আবুল হোসেন পাঁড়ের নেতৃত্বে করিম পাঁড় , রহিম পাঁড় , মনিরুল, ফারুক আনসার, গোলাম, নুবা, বুধো রউফসহ অন্য সন্ত্রাসীরা।
এ সময় তাঁদেরকে (ইসহাক ও আশরাফ) ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে নির্যাতন করে তারা। এতে গুরুতর আহত হলে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পুলিশকে খবর দেয় তারা (আবুল হোসেন পাঁড় ও অন্যরা)। পুলিশ কালীগঞ্জ হাসপাতালে নিতে না নিতেই মারা যান ইসহাক গাজী ও আশরাফ মীর। হামলায় আহত হন উভয়ের স্বজনরাও। ইসমাইল এ মামলায় আসামি করেছেন ৯১ জনকে।
মামলায় ইসমাইল আরো বলেন, ‘আমার ফুফু ফজিলা খাতুনের (নিহত আশরাফ মীরের স্ত্রী) দেওয়া মামলা নেয়নি পুলিশ। ঘটনার রাতে কালীগঞ্জ থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাগর আলী বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছেন। এ দুই মামলায় নিহত আশরাফ মীর ও তাঁর বাবা ইসহাক গাজী ছাড়াও তাঁদের আত্মীয়স্বজন হাবিব, তাইজুল, চাচা শহিদুল ইসলাম, আবুবকর, শহিদুল গাজী, ইসরাইল গাজী, মিকাইল গাজী, লুৎফর বিশ্বাসসহ অনেককে আসামি করেছে। তাঁদের কয়েকজনকে আহত অবস্থায় আটকও করেছে পুলিশ।’
এদিকে চার মামলায় নাম নির্দিষ্ট করে আসামি করা হয়েছে ২৪৩ জনকে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আসামি হয়েছেন আরো ৫০০ জন। এ ঘটনার পর থেকে পুরো ভূমিহীন জনপদ প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
নিহত আশরাফ মীরের সমর্থকরা গত ৩১ আগস্ট সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যার বিচার এবং উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীনদের পুনর্বাসন দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০০৪ সালে ব্যাপক সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে আশরাফ মীর ও তার সহযোগীরা চিংড়িখালী বৈরাগীরচকের সরকারি খাসজমি দখল করে বাড়িঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। সে সময় থেকে আশরাফের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এ বছরের ১ মার্চ আশরাফ মীর নেতৃত্বাধীন ১২০টি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদ করে দেয় আবুল হোসেনের নেতৃত্বে লোকজন। এর পর থেকে আশরাফ মীর ও তাঁর স্বজনরা সেখানে ফেরার চেষ্টা করেছে।
এ জন্য গত ১৯ আগস্ট আশরাফ মীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সহায়তা চেয়ে একটি আবেদন করেন। এতে তিনি বলেন, জামায়াত ও শিবির আশ্রিতরা তাঁদের উচ্ছেদ করেছে। তিনি ১২ বছর ধরে বসবাসের সেই জমিতে ফিরতে চান।
এর পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট ভোরে খাসজমি দখল নিয়ে ঘটা সংঘর্ষে গণপিটুনির শিকার হন আশরাফ মীর ও তাঁর শ্যালক ইসহাক গাজী। পরে পুলিশ তাঁদের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর আশরাফ ও ইসহাক মারা যান।
নিহত আশরাফ মীর ব্যাংক ডাকাতিসহ দুটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ২৪টি মামলা রয়েছে।

সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা