তিন ব্র্যান্ডের সিগারেট, খুলল জোড়া খুনের জট
রাজশাহীর একটি হোটেলকক্ষে মিজানুর রহমানের লাশ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলানো ছিল। সুমাইয়া নাসরিনের লাশ ছিল বিছানায়। ওই হত্যাকাণ্ডের কোনো ‘ক্লু’ পাওয়া যাচ্ছিল না। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ জানিয়ে দেয়, সুমাইয়াকে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করে মিজানুর!
কিন্তু ওই কক্ষে তিন ধরনের সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া যায়। একই মানুষ তিন ধরনের সিগারেট খেতে পারে? সাধারণত হয় না। ‘ক্লুহীন’ একটি ঘটনা তদন্তে এভাবেই এগিয়ে যান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপপরিদর্শক (এসআই) মুহিদুল ইসলাম।
গত বছর ২২ এপ্রিল রাজশাহী নগরীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের একটি কক্ষ থেকে মিজানুর ও সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়। মিজানুর ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সুমাইয়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।
এসআই মুহিদুল জানান, ঘটনার দিন ওই কক্ষ পরিদর্শনে যাওয়া প্রথম পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, মিজানের মৃতদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো থাকলেও তাঁর দুই হাত ওড়না দিয়ে বাঁধা ছিল। তাঁর প্যান্টটি কোমর থেকে ভাঁজের মতো করে নিচে নামানো ছিল। দেখেই মনে হচ্ছিল কেউ একজন টান দিয়ে নামিয়েছে। তা ছাড়া মিজানের গলার দুই পাশে দাগ ছিল। আত্মহত্যা করলে সেই দাগ একদিকে হওয়ার কথা। এসব চিহ্ন দেখে তখনই তাঁর মনে হয়েছিল এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
বোয়ালিয়া মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে এই জোড়া খুনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর আদালত তা গ্রহণ না করে পিবিআইকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

দলবল নিয়ে তদন্তে এগোতে থাকেন এসআই মুহিদুল। হোটেলের কক্ষে কেউ আছে কি না? থাকলে তাদের সন্ধানে শুরু হয় খোঁজ। মোবাইল ফোন ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাদের মধ্যে একজন গত ২০ অক্টোবর শুক্রবার রাজশাহী মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানান।
আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়া ওই আসামির নাম আহসান হাবিব ওরফে রনি। তিনি পাবনার ফরিদপুর থানার জন্তিহার গ্রামের বাসিন্দা। আহসান হাবিব রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। হত্যার সময় তিনি রাজশাহীতে থাকতেন। পিবিআই সদস্যরা ১৮ অক্টোবর বুধবার তাঁকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। নিহত মিজানুর ও আহসান হাবিবের একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পিবিআই আহসান হাবিবকে শনাক্ত করে।
পিবিআই সদস্যরা পরদিন ১৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাজশাহী মহানগরীর একটি ছাত্রাবাস থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত মাহমুদ, রাজশাহী কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আল-আমিন ও একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র বোরহান কবীর উৎসকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। এঁদের মধ্যে রাহাতের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়, আল আমিনের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলায় এবং উৎসের বাড়ি নাটোরের লালপুরে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত রাজশাহী মহানগর হাকিম জাহিদুল ইসলাম আসামি আহসান হাবিবের জবানবান্দি রেকর্ড করেন। হাবিব স্বীকার করেন, হোটেল কক্ষে মিজানুরকে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তারা সমুাইয়াকে সবাই মিলে ধর্ষণ করে। পুলিশের মেয়ে বলে ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা তাঁকেও মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে।
ঘাতকরাই ঠিক করে দেয় হোটেল!
জবানবন্দিতে হাবিব জানান, রাহাত মাহমুদের সঙ্গে প্রথমে সুমাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে মিজানুরের সঙ্গে নতুন করে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক হয়। এ নিয়ে রাহাত তাঁর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করেন। রাহাতের সঙ্গে আহসান হাবিব রনীর পরিচয় ছিল। রাহাত নগরের বিনোদপুরের একটি ছাত্রাবাসে থাকতেন। সেখানে তিনি আহসান হাবিবকে ডেকে নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেন। মিজানুরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা শুনে আহসান হাবিব বলেন, মিজানুরকে তিনি চেনেন। সে ল্যাংড়া। এরই মধ্যে মিজানুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুমাইয়া রাজশাহীতে আসছিলেন। মিজানুর তাঁকে নাটোরের বনপাড়া থেকে এগিয়ে নিয়ে আসেন। সে সময় মিজানুর আহসান হাবিবকে ফোন করে জানতে চান শহরের কোন হোটেলে উঠলে ভালো হয়। আহসান হাবিব তাঁকে হোটেল নাইসে ওঠার পরামর্শ দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ এপ্রিল রাত ৮ থেকে ১০টার মধ্যে হোটেল কক্ষে তারা মিজানুর ও সুমাইয়াকে হত্যা করে।
মিজানুরকে ফোন করে আনা হয়
আদালতে আহসান হাবিব জানান, হোটেলের ওই কক্ষে ঢুকে তাঁরা প্রথমে শুধু সুমাইয়াকে পান। তারপর তাঁরা মিজানুরকে ফোন করে ডাকার জন্য সুমাইয়াকে চাপ দেন। বাধ্য হয়ে সুমাইয়া মিজানুরকে ফোন করে ডাকেন। এরপর মিজানুরের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে সবাই মিলে ধর্ষণের পর সুমাইয়াকে হত্যা করা হয় বালিশ চাপা দিয়ে।
এ ঘটনার পরের দিন সুমাইয়ার বাবা আব্দুল করিম নগরীর বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে তরুণ-তরুণী দুজনকেই হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় হত্যার অভিযোগ করা হয়। মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

এ হত্যা মামলাটি তদন্ত করেন বোয়ালিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সেলিম বাদশা। পাশাপাশি মামলাটির ছায়া তদন্ত করেছিল পিবিআই। তবে পুলিশ পরিদর্শক মামলাটি তদন্ত শেষে সুমাইয়াকে ধর্ষণের পরে হত্যা করে মিজানুর নিজেই আত্মহত্যা করেছেন বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
কিন্তু এ প্রতিবেদনে সুমাইয়ার বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল করিম আপত্তি তোলেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদন দেওয়া হলেও পুলিশের এই কর্মকর্তার অভিযোগ, হোটেল কর্তৃপক্ষ মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছেন। এরপর পিবিআই ফের মামলার তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে এই হত্যার রহস্য বেরিয়ে এলো। ফলে এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন, সিসি ক্যামেরার আওতাধীন অভিজাত ওই হোটেলটিতে ঢুকে খুনিরা কীভাবে খুন করে বেরিয়ে গেল!
হোটেল নাইসে জোড়া খুনের রহস্য পিবিআই উদঘাটন করেছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সেলিম বাদশা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চাঞ্চল্যকর এই মামলা তদন্তকালে নিজের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, মামলা তদন্ত কালে তিনি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাননি। এ ছাড়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এবং রাসায়নিক পরীক্ষার ভিত্তিতে তিনি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন।

শ. ম সাজু, রাজশাহী