বাড়ছে সাপের দংশন, শিরনিতেও রক্ষা হচ্ছে না
টানা বৃষ্টিতে বেড়েছে পানি। কানায় কানায় ভরে গেছে ঝোপ-ঝাড়। গর্তে থাকা সাপগুলো আশ্রয় নিয়েছে লোকালয়ে। সেই ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে গ্রামবাসীর। রক্ষা পেতে চাল তুলে শিরনিও রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে। তবু থামছে না সাপের দংশন।
সাপের উৎপাতের এমন কাহিনী শোনা যাচ্ছে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চকমিরপুর ইউনিয়নে। সেখানকার শ্যামপুর গ্রামে গত চার দিনে বিষধর সাপের দংশনে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তিনজনকে।
সাপের দংশনে গত হয়েছে গ্রামের প্রয়াত আক্কাছ আলীর স্ত্রী আয়েশা বেগম (৫৫)। একই পরিণতি উজ্জ্বল হোসেনের ছেলে সাব্বির হোসেনের (৬)।
দংশন থেকে বাঁচতে শ্যামপুর গ্রামবাসী বাড়ি বাড়ি থেকে চাল তুলে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শিরনি করেছেন। কিন্তু যারা এ উৎপাত বন্ধ করতে পারত, সেই প্রশাসন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে নিজ বাড়িতে আয়েশাকে বিষধর সাপ দংশন করে। কবিরাজ দিয়ে ঝাঁড়-ফুক করেও তিনি সুস্থ হননি। পরদিন বুধবার সকালে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে পাশের বাড়ির শিশু সাব্বির আয়েশাদের বাড়ি খেলতে যায়। এ সময় তাকেও সাপ দংশন করে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে পাওয়া যায়নি চিকিৎসা। এরও পরে বিকেলে মানিকগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তার।
পরদিন শুক্রবার সকালে ওই গ্রামের অন্য এক বাড়িতে সাপের দংশনে আহত হন মোশারফ হোসেনের স্ত্রী রিতা আক্তার (২২)।
একইভাবে গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে লায়েক আলীর মেয়ে রোকেয়া আক্তার (১৬) আহত হয়। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। সাপের দংশন থেকে বাঁচতে গ্রামবাসী দুপুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল তোলে। বিকেলে শ্যামপুর মসজিদের সামনে তারা শিরনি রান্না করেন। ইফতার শেষে তা এলাকাবাসীর মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই শিরনি রান্নার সময় পাশের বাড়ির ইকবাল হোসেনের স্ত্রী রুমি আক্তারকে (২০) সাপে দংশন করে। তাঁকেও নেওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চকমিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক জানান, গ্রামে একের পর এক মানুষ সাপের দংশনে হতাহত হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনও প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে দৌলতপুর বাজারের ফার্মেসি থেকে কার্বলিক এসিড কিনে তিনি গ্রামবাসীকে দিয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আরশাদ উল্লাহ জানান, এ হাসপাতালে সাপের কামড়ের প্রতিষেধক ‘এন্টিভিনা’ সরবরাহ করা হয় না। তাই দংশনের শিকার কোনো রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপের প্রতিষেধক না থাকার বিষয়ে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন এ টি এম মতিউর রহমান বলেন, জেলা ও উপজেলার কোনো হাসপাতালেই এই চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। এই চিকিৎসা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেওয়া হয়। সব সাপই বিষধর নয়। এ কারণে সেখানে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে প্রতিষেধক ইনজেকশন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, সাপ সাধারণত মানুষের হাতে কিংবা পায়ে দংশন করে থাকে। তাই আক্রান্ত স্থানের কিছুটা ওপরে শক্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে রোগীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ