গাছ থেকে ফলটা পেড়ে আনার দায়িত্ব সরকারের
ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফরে আসার আগে থেকেই বাংলাদেশে অনেকটা সাজসাজ রব ছিল বিভিন্ন মহলে। গণমাধ্যমেও ছিল তার প্রতিফলন। নরেন্দ্র মোদির এই সফরকে কেউ বলেছেন ঐতিহাসিক, কেউ বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ; আবার কেউ আশায় ছিলেন, শেষবেলায় চমকপ্রদ কোনো ঘোষণার।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর ঢাকা-দিল্লি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, সাবেক কূটনীতিক আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তবে এ সফর থেকে যে চমক প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা মেলেনি বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সই হওয়া চুক্তি আর সমঝোতাগুলো বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্জন। ভারত বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা ঠিকঠাক থাকলেই কেবল অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।urgentPhoto
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এটা খুবই একটা ফলপ্রসূ সফর। এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের কিছু নাই। এর ফলটা এখনো কিন্তু গাছে ধরে নাই। একটা গাছ রোপণ করা হয়েছে। এই গাছ থেকে ফলটা আনার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের।’
আহসান এইচ মনসুর আরো বলেন, ‘দেড়শ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, এটা অবকাঠামো খাতে যাবে। এটা যদি সত্যি সত্যি আমাদের রাস্তা, রোড, রেল এবং নৌবন্দর-নৌপরিবহন খাতে দেয়, তাহলে ভালোই হবে। শুধু যদি আমরা টাটা বাস ইমপোর্ট করি বা ইন্ডিয়ান রেলকোচ নিয়ে আসি, তাহলে কিন্তু হয়তো অতখানি ভালো হবে না। রোড ট্যারিফটা কী হবে, সেটা আমাদের খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দ্বিপক্ষীয়ভাবে ঠিক করতে হবে, যাতে আমাদের স্বার্থ থাকে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে কী ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে এবং কোনো বিনিয়োগের আগে এটা হয়তো খুলে দেওয়াটা ঠিক হবে না, সেটাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আশেকা ইরশাদ বলেন, ‘চমক হয়নি। এটা ফুট ইনক্রিয়েটেড হয়েছে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা এখন সামনে সময় বলতে পারবে। তবে ঠিক এ মুহূর্তেই যে খুব একটা কিছু অর্জন মানে, একেবারে কংক্রিট হাতে পাওয়া অর্জন, আমার কাছে কিছু ও রকম মনে হয়নি।’
ভিসা প্রসঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আশেকা ইরশাদ বলেন, ‘ভিসাটা কিন্তু এখানে একটা বড় ব্যাপার ছিল। ভিসার ব্যাপারেও কিন্তু আমরা শুনেছিলাম যে হয়তো এইটা-ওইটা হবে; কিন্তু আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইন্ডিয়ার গভর্নমেন্ট থেকে ওই রকম কোনো কিছু পেলাম না। বর্তমানে যেগুলো হলো, সেটাকে আমরা একটা ভিত্তি ধরতে পারি। এই ভিত্তিটার ওপরে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে আরো সমৃদ্ধি বা একটা কো-অপারেশনের একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।’
আর দুই দেশ এবার যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, তার কতখানি বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো। পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারত বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা ঠিকঠাক থাকলেই দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমতে পারে বলে মনে করেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হেমায়েত উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘চাইব যে ভারতের ইনভেস্টমেন্ট, যেটা আপনার একটা স্পেশালই ইকোনমিক জোন হয়, সেখানে যদি ইনভেস্টমেন্ট আসে, তাহলে বাংলাদেশের লাভ অবশ্যই হবে। আর এটা যদি কাগজেই থেকে যায়, তাহলে তো কিছু করার নাই। তারপর আরো কিছু ওই যে আপনার এনার্জি সেক্টরে, যেগুলো হয়েছে সেইটা। কিন্তু তার চেয়েও বড় জিনিস যেটা আমি মনে করি সেটা হলো যে, বর্ডার এরিয়াতে আমরা চাই যে টেনশন কমুক। আননেসেসারি আমাদের সাধারণ লোক যাতে না মারা যায়।’
তবে ভারতের আরেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পর আবার দেশটির কোনো প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এতটা সাড়া ফেলেছে বলে মনে করেন তাঁরা। আশা করছেন, এবার এই জোরদার হওয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার পালা, আরো সামনের কাতারে এগিয়ে যাওয়ার পালা বাংলাদেশেরও।

রোকন উদ্দিন