ক্ষুদ্রঋণের কথা বলে ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ, গ্রেপ্তার তিন
রাজধানীর শাহ আলী এলাকা থেকে প্রতারণার অভিযোগে কথিত ক্ষুদ্র ঋণদান সমিতির সভাপতি ফয়েজউল্লাহ ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৪। গতকাল সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাব-৪ এর পরিচালক মোজাম্মেল হক।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন- ভোলার মো. ফয়েজ উল্লাহ (৫০), মুন্সীগঞ্জের আফরিন আক্তার (২৪) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোছা. তাসলিমা বেগম (৩৩)। গ্রেপ্তারের সময় প্রতারণার বিপুল মালামাল জব্দ করা হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শাহ আলী থানার মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর সভাপতি ফয়েজ উল্লাহসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড হিসেবে রেজিস্টার্ডভুক্ত হলেও প্রতারণামূলকভাবে শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে প্রচার ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এ সমিতির ২০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে ২৫০ থেকে ৩০০ জন সদস্য রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখেরও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। তবে, এ প্রতিষ্ঠানের কোনো রক্ষিত জামানত নেই বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়।
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের বলা হতো ১০ থেকে ১৫ দিন ঠিকমত নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয় প্রদান করলে তাদের ঋণ প্রদান করা হবে, যাতে তারা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু, ভুক্তভোগীদের দুএকজনকে ঋণ দিলেও কেউ সঞ্চয় থেকে ঋণ পেতো না তারা। এ কোম্পানির কিছু সদস্য দৈনিক ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সঞ্চয়/ডিপিএসের টাকা সংগ্রহ করতো। ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো তারা যদি সময়মত সঞ্চয়/ডিপিএসের টাকা না পরিশোধ করত। বলা হত, সঠিক সময়ে ঋণ না পাওয়ার কথাও। একইসঙ্গে জরিমানাও করা হবে বলেও জানানো হত। প্রতারণার আর একটি কৌশল হিসেবে ভুক্তভোগীদের বুঝানো হতো, দৈনিক মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে জমা করলে একসময় ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অভিযানের সময় তাদের অফিস থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ভর্তি ফরম, ঋণ গ্রহীতার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের জীবন বৃত্তান্ত, লিফলেট, সিল, বিভিন্ন নামে সঞ্চয় পাসবই, অব্যবহৃত পাস বই, দৈনিক কিস্তি ও ঋণ বিতরণের বিভিন্ন রেজিস্ট্রার, ব্যাংকচেকসহ ব্যাংক স্ট্যাম্প, আইডি কার্ডসহ নানা ধরনের সামগ্রী জব্দ করেছে র্যাব।
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এই প্রতারকচক্রের মাঠ পর্যায়ের কর্মী বা সদস্যদের মাধ্যমে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, সেলুনের কর্মচারী, মনোহারী ও ফুটপাতের দোকানদার, গৃহকর্মী ও নিম্নআয়ের মানুষদের টার্গেট করে ঋণের লোভ দেখিয়ে সঞ্চয়ের নামে তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ বা ডিপিএস করতে উদ্বুদ্ধ করতো।’
মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘মূল অভিযুক্ত ফয়েজ উল্লাহর নিজ জেলা ভোলা। তিনি ভোলার স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে জীবিকার তাগিদে ভোলা থেকে ঢাকায় এসে মিরপুরের ১৪ নম্বরে থেকে কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি কাফরুলের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অফিসার পদে চাকরি করেন। গত ২০২১ সালে নিজে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করে এবং পরবর্তীতে তিনি এই সমিতির নাম বেআইনিভাবে বিকৃত ও পরিবর্তন করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই কোম্পানির মোট সদস্য সংখ্যা ২৫০-৩০০ জন এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ৫ মাসে আনুমানিক ৫০ লাখেরও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক