আমাদের সংস্কৃতির অবনতি হয়েছে : বুলবুল মহালানবীশ
বুলবুল মহালানবীশ, নজরুল সংগীতশিল্পী ও লেখক। তাঁর আরেকটি বড় পরিচয়, তিনি কণ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যখন তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর। বর্তমানে গান গাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কর্মী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। শব্দসৈনিক হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে আলাপ করেছেন বুলবুল মহালানবীশ।
এনটিভি অনলাইন : শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আপনার অনেক স্মৃতি নিশ্চয়ই রয়েছে। কেমন ছিল সেই দিনগুলো?
বুলবুল মহালানবীশ : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমাদের যাওয়ার কল টাইম ছিল সকাল ১০টা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমরা বেতারে গান গাইতাম। নাটকে অভিনয় করতাম। আমাদের পরিশ্রমের তুলনায় বেতন অনেক কম ছিল। দুপুরে আমরা অল্প খাবার খেতাম। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের আফসোস ছিল না। বেতারে তো গান গেয়েছি। এ ছাড়া বিভিন্ন শরণার্থী জায়গায় ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আমরা উপস্থিত হয়ে গান গেয়েছি। আমাদের গান শুনে মুক্তিযোদ্ধরা অনুপ্রেরণা পেতেন। যেসব মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ক্যাম্পে ছিলেন, তাঁরা আমাদের গান শুনে নিজেদের ভালো রাখার চেষ্টা করেছেন। তখন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি, তাঁরা যুদ্ধ করতে ভয় পেতেন না, কিন্তু নিজের পরিবারের কথা স্মরণ করে অনেক কান্নাকাটি করতেন। তাঁদের কান্না দেখে আমরা অনেক কষ্ট পেতাম।
এনটিভি অনলাইন : দেশের কোন গানগুলো আপনারা বেশি গেয়েছেন?
বুলবুল মহালানবীশ : ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙর তোল তোল’ এই গান দুটি আমরা বেশি বেশি গেয়েছি। দেশকে স্বাধীন দেখার জন্য আমরা তখন অস্থির থাকতাম।
এনটিভি অনলাইন : বিজয়ের ৪৫ বছর পূর্ণ হলো। দেশ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কতখানি পূর্ণ হয়েছে?
বুলবুল মহালানবীশ : এটা বলা অনেক কঠিন। আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সব দিক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। একাত্তরে যুদ্ধ শুরু হলেও এর সূচনা ১৯৪৮ সালে হয়। যা হোক, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মাঝখানে আমাদের ভুল ইতিহাস জানানো হয়েছে। আমরা অন্ধকারে ছিলাম। এখন সেই অন্ধকার দূর হচ্ছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হচ্ছি। বেশ ভালো কাজ হচ্ছে, আবার কিছু খারাপও হচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে বলব, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ সরকার ১০৮ জন শব্দসৈনিককে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছেন। গেজেটও পাস হয়েছে। শব্দসৈনিকরা এখন ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। সামনে এই ভাতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আত্মমর্যাদার কারণে সব শিল্পী তাঁদের চাহিদার কথা মুখ ফোটে বলতে পারেন না। কিছু শিল্পীর হয়তো টাকা লাগে না, আবার কিছু শিল্পীর অর্থের অনেক সংকট। গেজেট পাস হয়েছে, এটাও অনেক ইতিবাচক দিক।
এনটিভি অনলাইন : এখনকার তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে কি দূরে চলে যাচ্ছে? আপনার কী মনে হয়?
বুলবুল মহালানবীশ : তরুণদের মধ্যে আমি ইতিবাচক অনেক ব্যাপার দেখছি। আবার নেতিবাচক দিকও আছে। আমি তরুণদের বলব, নিজের উন্নতি করার পাশাপাশি দেশের উন্নতির কথা ভাবতে হবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বিজয় এনেছি। কিন্তু এখনকার তরুণরা অল্পতে বেশি কিছু পেতে চায়। কাজের ভালো ফলাফল পেতে হলে পরিশ্রম করতে হয়। আমরা কৃষি খাতে, প্রযুক্তিতে অনেক উন্নতি করেছি। কথা হলো, শিক্ষিতরা প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সেটার অপব্যবহার করে না। কিন্তু অনেক অশিক্ষিত প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। সব দিকে উন্নতি হলেও আমাদের সংস্কৃতির অবনতি হয়েছে। বিশ্ব সংস্কৃতি বেশি চর্চা করতে গিয়ে মূলত আমরা মূল সংস্কৃতি থেকে সরে যাচ্ছি। সবাই সরে যাচ্ছে, এটাও বলব না। তবে নিজের সংস্কৃতি যদি চর্চা করা না হয়, তাহলে একদিন আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে যাব। এটা তো হতে দেওয়া যায় না।
এনটিভি অনলাইন : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কর্মী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনি কর্মরত আছেন। আপনারা এখন কী কী কাজ করছেন?
বুলবুল মহালানবীশ : আপাতত আমরা গান, কবিতা, নাটক নিয়ে কাজ করছি। আমাদের সংগঠনের সদস্য সংখ্যা এখন দুইশর ওপরে রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সংগঠনটির স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের অনেক কাজ করার পরিকল্পনা হচ্ছে। বই বের করারও ইচ্ছা আছে।

নাইস নূর