সর্দার ‘অচল’, মামলা সচল
শামসুল হক ওরফে লাল সর্দার। বয়স আশি ছুঁই ছুঁই করছে। নিজের প্রচেষ্টায় হাঁটার কোনো ক্ষমতা নেই তাঁর। লাঠি আর স্ত্রী নুরনাহারের কাঁধে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন তিনি। শ্বাসকষ্ট ও বার্ধক্যজনিত অসুখে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তাঁর জীবন।
দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারায় করা হুমকির একটি মামলায় আজ সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিমের আদালতে জামিন নিতে এসেছেন শামসুল হক। প্রায় সাতবছর ধরে এ মামলা ঢাকা মহানগর হাকিম হাসিবুল হকের আদালতে বিচারাধীন। শামসুল হকের বিরুদ্ধে যখন মামলা দায়ের হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর। তাঁর বিরুদ্ধে বাদী আহাম্মদ চৌধুরী ২০০৯ সালের ২১ মার্চ হুমকির অভিযোগ এনে উত্তরা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, বাদী ও তাঁর পার্টনার আব্দুল হাওলাদার এবং সিরাজ মিয়া উত্তরা থানাধীন আব্দুল্লাহপুর মৌজার জমিতে মূল মালিক হযরত আলী, আফফাজ আলী, শহর আলী, ওমর আলীদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রিকৃত আমমোক্তারনামার দলিলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে মালিক হয়ে ভোগ দখল করতে থাকেন। এ অবস্থায় শামসুল হক ওরফে লাল সর্দার ও তাঁর স্ত্রী নুরনাহারকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দেখাশোনা করতে দেন। বাদী পরবর্তীতে ওই জমিতে বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে আসামি শামসুল হকসহ অন্য আসামিরা তখন বাধা দেন।
জিডি করার পর উত্তরা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াকুব আলী ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন মর্মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে একটি মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেন। যার নম্বর- ৭৪/০৯।
পুলিশের কাছ থেকে এ প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত ২০০৯ সালের মে মাসে আসামি শামসুলহকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আসামি শামসুল হক ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত হতে জামিন নেন।
জামিন আবেদনে শামসুলের আইনজীবী উল্লেখ করেন, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও আসামি বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টের রোগী। শুধু আসামিকে হয়রানি করার উদ্দেশে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আসামি শামসুল বিভিন্ন সময় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন এবং সময়ের আবেদন করেছেন। ছয় বছর ধরে আদালতে হাজির থাকার পর চলতি বছরের ২০ আগস্ট শামসুল অসুস্থতার কারণে আদালতে হাজির হতে না পারায় ঢাকা মহানগর হাকিম হাসিবুল হক তাঁর জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। জামিন বাতিলের পর শামসুল আজ সোমবার আইনজীবী নিরুপম চক্রবর্তীর মাধ্যমে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক শামসুল হকের আগামী ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর করেন।
এদিকে আজ জামিন নেওয়ার সময় আসামি শামসুল বৃদ্ধ হওয়ার পরও আদালতের কাঠগড়ায় তাঁকে দাঁড়াতে হয়েছিল।
আসামি শামসুল হক অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে এনটিভি অনলাইনকে জানান, আহাম্মদ চৌধুরী মিথ্যা অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি তাঁর (আহাম্মদ চৌধুরী) জায়গায় তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকতেন। হঠাৎ তাঁকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বললে শামসুল কিছুদিন সময় চান। তিনি বলেন, ‘আমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে বললে আমি কাকুতি মিনতি করে একটু সময় চেয়েছিলাম।’
শামসুল হক আরো বলেন, ‘আহাম্মদ চৌধুরী ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছেন। তিনি মামলা প্রত্যাহার করে নিবেন বলে খালি ঘুরাচ্ছেন। এ অসুস্থ অবস্থায় আদালতে আসতে অনেক কষ্ট হয়। সাততলায় উঠতে পারি না বাবা। গরিবের কোনো খানে জায়গা নাই।’
আসামির আইনজীবী নিরুপম চক্রবর্তী বলেন, ‘আসামি নিরপরাধ। তিনি বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তি। তিনি বাদীকে হুমকি দিতে পারেন, তা একেবারে হাস্যকর। বিচারক আজ আসামির জামিন স্থায়ী না করে ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিন বহাল করেছেন। মামলায় বাদীসহ অন্য কেউ এখনো সাক্ষী দিতে না আসায় মামলাটি ঘুরছে। কিন্তু আদালত চাইলে মামলাটি ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৮ ধারায় ক্লোজ করে দিতে পারেন।’
রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আজাদ রহমান বলেন, ‘আসামি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকায় আজ আদালতে জামিন নিয়েছেন। মামলায় সাক্ষী না আসায় এখনো তা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বাদীকে সাক্ষী দেওয়ার জন্য অনেক বার নোটিশ করা হয়েছে, কিন্তু বাদী আদালতে আসছেন না। আগামী তারিখে আসামি শামসুল আদালতে না এলে আবারও আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী রায়হান মোর্শেদ বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারার মামলাটি আপসযোগ্য। এ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধজনক ভীতি প্রদর্শনের অপরাধ করে, তাহলে সে ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
রায়হান মোর্শেদ আরো বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারার মামলাটি এত দিন ধরে বিচারাধীন থাকাটা অস্বাভাবিক। আর আজ বৃদ্ধ শামসুলকে আদালত স্থায়ী জামিন না দিয়ে বিচারিক মনোভাব দেখাননি। এমন বয়স্ক লোকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ একেবারে বানানো।’
এ বিষয়ে বাদীর মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

নিজস্ব সংবাদদাতা