মনযোগ দিয়ে উত্তর শুনলেন খালেদা জিয়া
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আজ বৃহস্পতিবার মোট চারজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন আদালত। এর মধ্যে তিনজনকে জেরা করেন মামলার আসামি ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। জেরা চলার সময় খালেদা জিয়াকে মনোযোগ দিয়ে আইনজীবীদের প্রশ্ন এবং সাক্ষীর উত্তর শুনতে দেখা যায়।
হাল্কা হলুদ রঙ্গের শাড়ি পরিহিত বিএনপির চেয়ারপারসন এ সময় এজলাস কক্ষে সামনে দিকে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আদালত তাঁর কার্যক্রম শুরু করেন।
এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্ল্যা মিয়া আদালতকে জানান, তাঁদের পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে থাকায় তাঁর পরিবর্তে অ্যাডভোকেট আব্দুর রেজাক খান সাক্ষীকে জেরা করবেন। পরে অ্যাডভোকেট আব্দুর রেজাক খান মামলার সাক্ষী পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এইচ এম ইসমাইল হোসেনকে জেরা শুরু করেন। জেরার কথোপকথনের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-
আইনজীবী : আপনি কত সালে পূবালী ব্যাংকে যোগদান করেন?
সাক্ষী : ০৯/০৯/১৯৯৬ সালে।
আইনজীবী : তখন আপনার পদবি কী ছিল?
সাক্ষী : জুনিয়র অফিসার।
আইনজীবী : প্রিন্সিপাল অফিসার হয়েছেন কবে?
সাক্ষী : ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে।
আইনজীবী : পূবালী ব্যাংকে কম্পিউটারাইজড লেনদেন চালু হয় কবে?
সাক্ষী: ২০০০ সালে।
আইনজীবী : আপনি দুদককে যে নথি সরবরাহ করেছেন তা কি আইন সিদ্ধ ছিল?
সাক্ষী : হাঁ
আইনজীবী : আপনি দুদককে যে নথি দিয়েছেন তা কি ব্যাংকে রক্ষিত ছিল না কি নতুন করে তৈরি করে দিয়েছেন?
সাক্ষী : নতুন করে তৈরি করে দিয়েছি।
আইনজীবী : নথি কি একজন গ্রাহক চাইলে আপনারা সরবরাহ করে থাকেন?
সাক্ষী : না ।
আইনজীবী : আাদলতের অনুমতি ছাড়া নথি দেওয়া যায় না তা জানেন?
সাক্ষী : হাঁ
আইনজীবী : দুদকের চাপের মুখে নথি দিয়েছেন।
সাক্ষী : ইহা সত্য নয়।
আইনজীবী : নথি চেয়ে দুদকের পাঠানো পত্র আপনি দেখেছেন কবে?
সাক্ষী : ২৫ /০৯/ ১১ সালে।
আইনজীবী : চিঠি কি আপনার কাছে এসেছিল?
সাক্ষী : না। আমি পরে পেয়েছি।
আইনজীবী : ওই চিঠিতে কী লেখা ছিল।
সাক্ষী : না দেখে বলতে পারব না।
আইনজীবী : দুদক বা যে কেউ চাইলে নথির মূলকপি দেওয়ার নিয়ম নেই তা জানেন?
সাক্ষী : হাঁ জানি।
আইনজীবী : আপনি মূলকপি নিয়ে দুদকে গেছেন?
সাক্ষী : হাঁ
আইনজীবী : নেওয়ার আগে দুদকের কেউ আপনার কাছে এসেছে?
সাক্ষী : না আসেনি।
আইনজীবী : নেওয়ার পর দুদকের পক্ষ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন?
সাক্ষী : হাঁ পেয়েছি।
আইনজীবী : ওই চিঠিতে মূলকপি ফেরৎ দেওয়ার কথা রয়েছে?
সাক্ষী : হাঁ
আইনজীবী : ব্যাংকে মূলকপি রাখা হয়েছে মর্মে উল্লেখ আছে?
সাক্ষী : নেই।
আইনজীবী : আপনি ব্যাংকে মূলকপি নিয়েছেন আপনার নাম উল্লেখ আছে?
সাক্ষী : নাই।
আইনজীবী : চিঠির নিচে কোনো স্বাক্ষর-সিল ছিল?
সাক্ষী : না।
আইনজীবী : চিঠিতে সঞ্চয় হিসাব ও চলতি হিসাবের সব ডিজিট নম্বরের উল্লেখ আছে?
সাক্ষী : নাই।
আইনজীবী : নথি সরবরাহ করে আপনারা বেআইনি কাজ করে গ্রাহকের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন?
সাক্ষী : ইহা সত্য নহে।
আইনজীবী : কোনো কারণ ছাড়াই হিসাব নম্বর দুদককে দিয়েছেন?
সাক্ষী : ইহা সত্য নহে।
আইনজীবী : আপনি অসত্য সাক্ষী দিয়েছেন?
সাক্ষী : ইহা সত্য নহে।
এর পর দুদকের অপর সাক্ষী মকবুল আহমেদকে জেরা করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।
আইনজীবী : দুদককে আপনি জবানবন্দি দিয়েছেন?
সাক্ষী : হাঁ
আইনজীবী : জব্দ তালিকা ব্যাংকের কোন শাখায় সংরক্ষিত ছিল?
সাক্ষী : সাত মসজিদ শাখায়।
আইনজীবী : আপনাকে উল্লেখ করে দুদক কোনো চিঠি দিয়েছে?
সাক্ষী : হাঁ।
আইনজীবী : আপনি কি কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত?
সাক্ষী : না।
আইনজীবী : ব্যাংকের পে- অডার করার ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক?
সাক্ষী : না।
আইনজীবী : অ্যাকাউন্ট ছাড়া পে-অর্ডার করা যায় না।
সাক্ষী : ইহা সত্য নয়।
আইনজীবী : দুদকের ভয়ে ভীত হয়ে আপনি নথি নিয়ে গেছেন?
সাক্ষী : ইহা সত্য নয়।
আইনজীবী : নথির রেকডপত্র পরবর্তীতে ভিন্ন কালি ও ভিন্ন হাতে লেখা হয়েছে?
সাক্ষী : সঠিক নহে।
জেরা শেষে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদারের বেঞ্চে আজ চারজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তাঁরা হলেন পূবালী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন, ব্যাংক কর্মকতা মকবুল আহমেদ, ফাহমিদা রহমান ও সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ড. হাফিজুর রহমান।
দুদকের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন মোশাররফ হোসেন কাজল। খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন।
এর আগে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আদালতে শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়। বেলা ১১টা ২ মিনিটে আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া। জেরা শুরু হওয়ার পর জব্দ তালিকার একটি বিবরণ একজন সাক্ষী উপস্থাপন করতে শুরু করলে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করেন। এ সময় খানিকটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে বিচারক আপত্তি ওঠা অংশটুকু বাদ দিয়ে তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি।
জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১০ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় দুর্নীতির অভিযোগে এ মামলা করেছিলেন দুদকের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ।
ওই মামলার অপর আসামিরা হলেন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।
অন্যদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় আরো একটি মামলা করে দুদক।
মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

জাকের হোসেন